রেশম পোকা (Silk Insect)

এই পোষ্টের মাধ্যমে আমরা রেশম পোকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবো।

রেশম পোকা

রেশম উৎপাদনকারী পোকাকে রেশম পোকা বলা হয়। প্রাণিজগতের আর্থ্রোপোডা পর্বের রেশম পোকা এক প্রকার পতঙ্গ। রেশম পোকার শরীরের লালা/রস বাতাসের সংস্পর্শে আসলে তা বিশেষ ধরনের আঁশে পরিণত হয়। এই আঁশকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুতায় পরিণত করা হয়। আঁশ দ্বারা তৈরি হওয়া সুতাই রেশম সুতা।  

রেশম সুতা উৎপাদনের জন্য এই পোকা চাষ করা হয় বাংলাদেশ। এই পোকা পালন করার জন্য তুঁত গাছ ব্যবহার করা হয়। সাধারনত তুঁত গাছের পাতা খেয়ে পোকার শূককীট বড় হয়ে উঠে এবং রেশম গুটি তৈরি করে। যেসব উঁচু স্থানের তুঁত গাছ জন্মায় সেখানেই রেশম পোকা চাষ করা হয়। এসব চাষের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা হচ্ছে ২১° – ২৯°সেলসিয়াস এবং ৯০% আদ্রতা।

রেশম পোকার বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস

নাম: বোম্বেক্স মৌরি (Bombyx Mori)

জগৎ: অ্যানিমালিয়া (Animalia)

শ্রেণী: পোকা (Insect)

প্রজাতি: বি.মৌরি (B.mori)

চাষের স্থান

বাংলাদেশের সব থেকে বেশি রেশম চাষ হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।

  • নাটোর
  • পাবনা
  • বগুড়া
  • রাজশাহী
  • ময়মনসিং
  • দিনাজপুর
  • রংপুর
  • টাঙ্গাইল
  • সিলেটে রেশম চাষ হয়।

জীবন চক্র

রেশম পোকার জীবনচক্র চারটি পর্যায়ে বিভক্ত।

  1. ডিম (Egg)
  2. শূককীট (Larva)
  3. মূককীট (Pupa)
  4. মথ (Moth)

পূর্ণাঙ্গ দশার পোকাকে মথ বলা হয়।

স্ত্রী মথ গাছের পাতার উপর দিয়ে চলার সময় প্রায় ৪০০ – ৫০০ ডিম পাড়ে। ডিমের রং ফ্যাকাশে হলুদ। ডিম পাড়তে সময় লাগে ২৪ ঘন্টার মতন, ডিম পারা শেষ হলে স্ত্রী মথ মারা যায়। ৮ – ৯ দিনের মাথায় ডিমের গায়ে কালো কালো দাগ পরে। প্রায় ১০ দিনের মাথায় ডিম পুরো কালচে হয়ে যায়। তারপর ১০ – ১২ দিনের মাথায় ডিম ফুটে শূককীট বের হয়। শূককীটকে প্রথম দশায় পুল বলা হয়ে থাকে।

প্রথমে এদের গায়ের রং হালকা বাদামি ও সাদা থাকে। এরা খুবই ক্ষুধার্ত থাকে তাই এরা প্রচুর পরিমানে তুঁত গাছের পাতা খেয়ে বড় হয়। এই সময় এরা দিনে প্রায় ১১-১৩ বার তুঁত পাতা খায়ে ১৮ – ২৪ ঘন্টা নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে। তারপর তারা তাদের দেহের খোলস পাল্টায়ে আবার তুঁত গাছের পাতা খেতে শুরু করে। এরকম করে এরা ৪ বার খোলস পাল্টায়। একটি পূর্ণাঙ্গ শূককীট প্রায় দুই ইঞ্চি লম্বা হয় এবং তিনটি খণ্ডে বিভক্ত থাকে (মস্তক, বক্ষ ও উদর)।

রেশম পোকার বক্ষে তিন জোড়া এবং উদরে পাঁচ জোড়া পা থাকে। এদের দেহের পার্শ্ব বরাবর দশ জোড়া শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে ছিদ্র থাকে। চতুর্থবার খোলস পালটানো পরে এরা খাবার বন্ধ করে দেয়, এবং মূককীটে পরিণত হতে শুরু করে।

পূর্ণাঙ্গ মূককীটের দেহে একটি লম্বা রেশম গ্রন্থি থাকে। গ্রন্থিতে থাকে এক প্রকার রস থাকে, যা নালী দিয়ে মুখের বাইরে আসে। এই রস বাতাসের সংস্পর্শে আসলে শক্ত হয়ে যায়। রেশম পোকা এই সময় মিনিটে প্রায় ৬৫ বার মুখ ঘুরিয়ে রস দিয়ে দেহের চারপাশে আবরণ সৃষ্টি করে। আস্তে আস্তে এই আবরণ শক্ত হয়ে খোলসে পরিণত হয়। এই আবরণ সমূহকে মূককীট গুটি বলা হয়।

রেশম পোকার এই পরিবর্তন হওয়া কে মেটামোর্ফোসিস বলা হয়। এই পরিবর্তনের কারণে এদের দেহের আকার ছোট হয়ে যায়। প্রায় ১০ দিন মূককীট দশায় থাকার ফলে রেশম পোকার দেহ থেকে এক প্রকার রস বের হয়। এই রস খোলসের এক প্রান্তকে গলিয়ে ফেলে। তারপর এরা গুটিকে কেটে বাইরে বের হয়ে আসে। এই সময়ে রেশম পোকার  জীবনচক্রে পূর্ণাঙ্গ মথ দশা পায়।

গুটি কেটে পুরুষ মথ আগে বের হয়ে আসে।পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় স্ত্রী-পুরুষ মথ যৌন মিলনে অংশ নেয়।

তারপর পুরুষ মথটি মারা যায়। আর স্ত্রী মথটি ডিম পাড়ার পর মারা যায়।

রেশম গুটি হতে রেশম সুতা সংগ্রহ

শূককীট পর্যায় শেষ করে রেশম পোকা তার খাবার বন্ধ করে দিয়ে, দেহ থেকে বের হওয়া লালা দিয়ে তার দেহকে ঢেকে ফেলে। তা দেখতে ডিম্বাকৃতির গুটির মতন দেখায়। চাষিরা এই গুটি গরম পানিতে চুবিয়ে রেশম পোকাকে মেরে ফেলে।

গরম পানির সংস্পর্শে এসে গুটি নরম হয়ে যায়। তারপর চাষিরা যত্নসহকারে কাঠি দিয়ে গুটি হতে রেশম সুতার একটি প্রান্ত বের করে আনে, তারপর এই প্রান্ত ধরে ধীরে ধীরে টেনে দীর্ঘ সুতা বের করে আনা হয়। সাধারণত একটি গুটিতে ৪০০ – ৫০০ গজ সুতা পাওয়া যায়।

রেশম সুতার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে Click Now.

বাংলাদেশ রেশম চাষ

অনেক অনেক বছর আগে থেকে বাংলাদেশে রেশম চাষ হয়ে আসছে। ধারণা করা হয়, চীন থেকে বাংলাদেশের রেশম চাষ শুরু হয়েছিল।

বাংলাদেশের রেশম কাপড়কে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়

  • গরদ
  • তসর
  • মটকা

গরদ

সর্বোচ্চ মানের রেশম সুতা থেকে তৈরি হত এই গরদ কাপড়। রাজ পরিবার এবং অভিজাত পরিবারের মেয়েরা এই কাপড় পরিধান করতেন।

তসর

নিম্নমানের রেশম সুতা দ্বারা তৈরি এই তসর কাপড়। মাঝে মাঝে এই কাপড় অভিজাত পরিবারের মেয়েরা পরতেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যেত এই তসর কাপড় দ্বারা অভিজাত পরিবারের পর্দার কাজে ব্যবহার করত। কিন্তু মধ্যবিত্ত সমাজে এই তসর কাপড়ের কদর ছিল।

মটকা

গরদ এবং তসর কাপড় তৈরি করার সময় যেই রেশম সুতাগুলো বাতিল হত তার সাথে ভালো কিছু রেশম সুতা মিশিয়ে এই মটকা কাপড় তৈরি করা হতো। এই মটকা কাপড় দিয়ে গায়ের চাদর, পরনের ধুতি তৈরি হতো।

প্রয়োজনীয় কিছু লিংক।

ইয়ার্ন টুইস্ট | Yarn Twist সম্পর্কে জানতে – ক্লিক করুন

ইয়ার্ন ও থ্রেড এর পার্থক্য জানতে – ক্লিক করুন

ইয়ার্ন ডাইং কি জানতে – ক্লিক করুন

কাউন্ট নিয়ে যত কথা এবং এর প্রকারভেদ সম্পর্কে জানতে – ক্লিক করুন

Leave a Comment